হাওজা নিউজ এজেন্সি: মিনার-ই-পাকিস্তানের সবুজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে বিশেষ বক্তব্য দেন আল্লামা ড. মুহাম্মদ তাহেরুল কাদরি। তিনি উত্তম চরিত্র এবং সীরাতে নববীর সৌন্দর্যময় বৈশিষ্ট্য—নম্রতা, সদাচরণ, মানুষের সঙ্গে সহজ-সরলভাবে মেলামেশা এবং আন্তরিকতা—কে একজন মুমিনের নাজাতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মানুষের ব্যক্তিত্ব এমন হওয়া উচিত, যাতে অন্যরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মেলামেশায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। প্রকৃত মুমিন সে-ই, যে অন্যের জন্য সহজতা সৃষ্টি করে, বিপদের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং নিজের আচরণের মাধ্যমে কারও জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায় না। এসব গুণ মানুষের ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রতিফলন থাকা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক মানুষের আত্মসমালোচনা করা উচিত—তার আচরণ ও উপস্থিতিতে অন্যরা শান্তি, স্বস্তি ও সহজতা অনুভব করে, নাকি বোঝা ও কষ্ট অনুভব করে। মানবিক ভালোবাসার ফসল সেই হৃদয়ের জমিনেই ফলনশীল হয়, যে হৃদয় কোমল, উদার ও নির্মল। প্রকৃত নৈকট্য শুধু শারীরিক সম্পর্কের নাম নয়; বরং এটি হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক। আর মহানবী ﷺ-এর সীরাত সমগ্র মানবজাতির জন্য ভালোবাসা, মমতা ও কল্যাণকামিতার এক বাস্তব আদর্শ।
আল্লামা তাহেরুল কাদরি বলেন, কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা অনুযায়ী, পরম করুণাময় আল্লাহর বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিনয় ও কোমল আচরণ। সীরাতে নববীতেও কোমলতা, ক্ষমাশীলতা ও মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। একবার মসজিদে এক বেদুঈন ভুল করে ফেললে রাসুলে আকরাম ﷺ তাকে সংশোধন করেছিলেন; কিন্তু তার হৃদয়ে আঘাত দেননি। এমনকি চরম নির্যাতনের মুখেও তিনি তাঁর বিরোধীদের জন্য হেদায়াত ও ক্ষমার দোয়া করেছেন।
তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা কোমলতা ও সদাচরণ পছন্দ করেন। এ কারণেই হযরত মুসা ও হজরত হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের মতো উদ্ধত ও অবাধ্য ব্যক্তির সঙ্গেও কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, দাওয়াতের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়; বরং তার হৃদয় জয় করা। তাই আলেম ও দাঈদের দাওয়াতি কর্মকাণ্ডে ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও কোমলতা অবলম্বন করা উচিত।
তিনি যুবকদের প্রশিক্ষণ ও আত্মশুদ্ধির একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, মহানবী ﷺ এক যুবকের ভুল আকাঙ্ক্ষাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান না করে প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার মাধ্যমে তার বিবেক ও উপলব্ধিকে জাগ্রত করেছিলেন। এর ফলে যুবকটি স্থায়ীভাবে সংশোধিত হয়ে যায়। এটাই নববী তারবিয়াতের পদ্ধতি—মানুষের বিবেক ও চেতনাকে জাগ্রত করে তাকে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য উপলব্ধি করতে সহায়তা করা।
তিনি আরও বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ কেবল সভা, শোভাযাত্রা ও মাহফিল আয়োজনের নাম নয়; বরং সীরাতে নববীর শিক্ষা নিজের বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করাই এর মূল উদ্দেশ্য। রাসুল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত দাবি হলো তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য, উত্তম চরিত্র অর্জন এবং নিজের জীবন ও আচরণের সংশোধন। আমাদের উচিত নিজেদের জীবনকে সীরাতে তাইয়্যিবার আদর্শে গড়ে তুলে সমাজে ভালোবাসা, কোমলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবকল্যাণের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া।
অনুষ্ঠানে মিনহাজুল কুরআন ইন্টারন্যাশনালের সুপ্রিম কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. হাসান মুহিউদ্দিন কাদরি, মিনহাজুল কুরআন ইন্টারন্যাশনালের সভাপতি প্রফেসর ড. হুসাইন মুহিউদ্দিন কাদরি, ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন ফর আল-আজহার গ্র্যাজুয়েটস (WAAG)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. ওয়াইল মাহমুদ আস-সাইয়্যিদ বুখাইত, আল-আজহার শরিফের ইসলামিক রিসার্চ একাডেমির মহাসচিব ফাজিলাতুশ শাইখ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবদুদ দাইম আল-জুন্দি, মিনহাজুল কুরআন ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব খুররম নওয়াজ গন্ডাপুর, বিশিষ্ট আলেম-ওলামা ও মাশায়েখ, বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি, মিনহাজুল কুরআন আন্দোলন ও এর বিভিন্ন ফোরামের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যক্তিত্বসহ বিপুলসংখ্যক প্রবীণ, নারী ও শিশু অংশগ্রহণ করেন।

আপনার কমেন্ট